সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০১০

সুকুমার রায়কে নিয়ে সত্যজিত রায়ের তোলা তথ্যচিত্র

বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিত রায়, তাঁর বাবা সুকুমার রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যাতে তিনি তুলে ধরেন সুকুমার রায়ের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বৈচিত্র্যময় জীবন ও বহুমুখী প্রতিভার নানা দিক। তিরিশ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই রঙিন তথ্যচিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৮৭ সালে। ছবিটির পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যটিও সত্যজিত রায়ের নিজের হাতে করা। ছবিটিতে ভাষ্য পাঠ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আর সঙ্গীত পরিচালনা যথারীতি সত্যজিত রায়ের নিজেরই। পর্দায় সুকুমার রায়ের রচিত বিভিন্ন নাটক ও সাহিত্যের চিত্ররূপে, বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকায় উপস্থিত হয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, সন্তোষ দত্ত, তপেন চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ খ্যাতনামা অভিনেতারা। সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন বরুন রাহা, শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন অশোক বসু, শব্দগ্রহণ করেন সুজিত সরকার এবং সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন দুলাল দত্ত। সিনেমাটির প্রযোজনা করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তথ্যচিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর সরকারি উদ্যোগে এটিকে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে বিনামূল্যে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তথ্যসূত্রঃ  http://www.satyajitray.org/films/sukumarray.htm

তথ্যচিত্রটি ইউটিউব থেকে সরাসরি দেখতে পারেন, নিচের ভিডিও প্লেয়ারে।

সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০১০

বদ্রীনাথ থেকে বসুধারার পথে

বদ্রীনাথে কুয়াশা ঘেরা সকাল
বদ্রীনাথে কুয়াশা ঘেরা সকাল

যে কোন পাহাড়ী জায়গাতেই সকালবেলার শীতটা বেশ হাড় কাঁপানোই হয় দেখেছি। বদ্রীনাথে এসে এই মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহেও তার কোন ব্যাতিক্রম পেলাম না। কাল সারাটা দিন ধরে বাস জার্নি করেছি, অবশ্যই ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়কে যদি সারা দিন বলে ধরা হয় তবেই। এটাই নাকি চার ধাম (কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, যমুনেত্রী) তীর্থযাত্রার পিক টাইম (আগে জানতাম না, জানলে অন্য সময়ে আসতাম)। ফলে যোশিমঠে ওয়ান ওয়ে রাস্তায় বিরাট লাইন, সেখানে অপেক্ষা করতে করতেই অন্ধকার নামার উপক্রম হল। হরিদ্বার থেকে যে বেসরকারি সংস্থার বাসে এসেছি তাকে স্থানীয় লোকজন “ভূখ হরতাল” বাস বলেই চেনে, যদিও এর অফিসিয়াল নাম “কোটদ্বার পরিবহন লিমিটেড”। বোধহয় সংস্থার কর্মীরা অনশন করে নিজেদের দাবিদাওয়া আদায় করেছিল কোন এক সময়ে; সেই থেকেই এই নামটা চালু হয়ে গেছে। বাসগুলো ভাঙাচোরা না হলেও, আরামদায়ক একেবারেই নয়, তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কিন্তু রাস্তায় বেরলে সে আর কতক্ষণ থাকে। বাস ভর্তি উঠেছে বিহার, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থানের দেহাতী তীর্থযাত্রীর দল। ভোর বেলা বাসে উঠেই সিট নিয়ে ঝগড়া লাগাল। ওদের সবাইকে সামনের দিকের জানলার ধারে সিট দেয়নি কেন, হোটেল থেকে বুকিং করার সময় তো বুকিং এজেন্ট তো এরকমই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর হৃষীকেশ থেকে পাহাড়ী রাস্তা ধরতেই ওয়াক ওয়াক – বমি করে গোটা বাস ভাসাতে লাগল। এর মধ্যে নাকে রুমাল চেপে জানলার দিকে তাকিয়ে যতদূর সম্ভব প্রাকৃতিক দৃশ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার প্রাণপণ চেষ্টা আমাদের। বাসের কন্ডাক্টর দেখলাম বেজায় পরিশ্রমী আর সৎ। সারা রাস্তায় বাড়তি পয়সার লোভে পড়ে একটাও বাড়তি লোক তুলল না। আবার যোশীমঠে এসে রাস্তা খোলার জন্য অপেক্ষা করার সময়, ঝাঁটা আর জল নিয়ে গোটা বাস পরিষ্কার করল। আহা! এমন কন্ডাক্টর যদি কলকাতার বাসগুলোয় থাকত। যোশীমঠ থেকে বাস ছাড়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে এল। ধ্বসে ভাঙাচোরা পাক খাওয়া পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে লাফাতে লাফাতে বাস ক্রমশই উপরে উঠতে লাগল। অন্ধকারে বাইরের দৃশ্য কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, শুধু জানলার কাচ মাঝে মাঝে পাহাড়ী ঝর্নার জলে ভিজে যাচ্ছে। আর বুড়োদের শ্বাসকষ্ট দেখে বুঝছি, উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। অন্ধকার রাস্তায় ছুটতে ছুটতে কোন একটা গাড্ডায় পড়ে বাসটা প্রবল একটা ঝাঁকুনি খাচ্ছে আর বাসে বোঝাই দেহাতীর দল আতঙ্কিত গলায় সমস্বরে চিৎকার করে উঠছে “বোলো শ্রী বদ্রিনাথজী কি জয়”। শেষের দিকে কয়েকজন তো কাঁদতে শুরু করে দিল। তখন মনে মনে ভাবছি “ওরে ব্যাটা তোদের এতই যদি মরার ভয় তো এই সব দুর্গম তীর্থস্থানে যাওয়া কেন? ঘরে বসে পেন্নাম ঠুকলেই তো পারিস।” যাত্রাপথের শেষ চরণে বেশ একটা মিস্টিক রোমাঞ্চের অনুভূতি আসছিল, দেহাতীগুলোর দলবদ্ধ চিৎকারে পুরো মেজাজটাই মাটি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বদ্রীনাথে পৌঁছেই গেলাম। সেখানে গিয়েও দেখি বিশাল ট্রাফিক জ্যাম। অনেকটা জ্যাম ঠেলে, বেশ কিছুটা রাস্তা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যস্থল ভারত সেবাশ্রমের ধর্মশালায়। এখানেই আজকের মত রাত্রিবাস। রাতে খেতে গিয়ে দেখি একে নিরামিষ তাতে আবার বিস্বাদ খিচুড়ি আর পাঁপড়ের আয়োজন রয়েছে রন্ধনশালায়। কি আর করি, খিদেয় পেট জ্বলছে, অগত্যা ওই বিস্বাদ খিচুড়ি গিলে নিলাম পেট ভরে। ভারত সেবাশ্রমের ক্যান্টিনে এত অখাদ্য খাবার আর কোথাও পাইনি। পরে জেনেছিলাম খরচ বাঁচানোর জন্য ক্যান্টিনের বরাত দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারকে। নিজের মুনাফা বাড়াতে খাবারের এই দশা করে ছেড়েছে সে।

বদ্রীনাথ মন্দিরের সামনে তীর্থযাত্রীর সারি
বদ্রীনাথ মন্দিরের সামনে তীর্থযাত্রীর সারি

বদ্রীনাথের পারিপার্শ্বিক
বদ্রীনাথের পারিপার্শ্বিক

পাহাড়ে ঘেরা বদ্রীনাথ ধাম
পাহাড়ে ঘেরা বদ্রীনাথ ধাম

সকালে উঠে প্রথমে কনকনে বরফ ঠান্ডা জলে হাত মুখ ধুয়ে, চানের জন্য গরম জলের সন্ধান করতে কিচেনে ছুটলাম। গরম জল জোগাড় করে স্নান সেরে তৈরী হতে হতে কিছুটা দেরিই হয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে দেখি বদ্রীনাথের মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের বেশ বড় লাইন পড়ে গেছে। আমার সহযাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন বদ্রীনাথজীর দর্শন পাওয়ার জন্য উদগ্রীব। আমার অবশ্য সে বালাই নেই, তাই তাদের মন্দিরে ঢোকার লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, মন্দিরের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে কিছু ছবি তুললাম আর স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জেনে নিলাম মানা গ্রাম হয়ে বসুধারা জলপ্রপাত পর্যন্ত যাবার পথের হালহকিকত। যা বুঝলাম মানা পর্যন্ত রাস্তা খুবই সোজা, একেবারে পাকা মোটর চলার রাস্তা। কিন্তু এরপরের অংশটা নিয়েই হল সমস্যা। দেখলাম স্থানীয় লোকজনের মানা থেকে বসুধারা পর্যন্ত রাস্তা সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতাই নেই। ভাষা-ভাষা ভাবে যা বলছে, তার থেকে আমরাই বেশি জানি। বসুধারা প্রপাত সম্পর্কে ঠিকঠাক হদিশ পাওয়ার সেরা জায়গা ছিল মন্দিরের পাশেই সাধুদের আখড়াগুলো। কিন্তু সেটা আর আমরা জানব কি করে? যাই হোক ততক্ষণে ধার্মিক বন্ধুদের বদ্রীনাথজীর দর্শন করা হয়ে গেছে। পেটে সবারই তখন চনচনে খিদে। সবাই মিলে একটা খাবার দোকানে ঢুকে, ছোলা-পুরিতে খিদে মিটিয়ে রওনা দিলাম মানা হয়ে বসুধারার পথে।

মানার পথ থেকে দেখা বদ্রীনাথ
মানার পথ থেকে দেখা বদ্রীনাথ

বদ্রীনাথকে পিছনে ফেলে, মানার আরও কাছাকাছি
বদ্রীনাথকে পিছনে ফেলে, মানার আরও কাছাকাছি

প্রকৃতির মাঝে বিহ্বল
প্রকৃতির মাঝে বিহ্বল

আমাদের যাত্রাপথের প্রহরী
আমাদের যাত্রাপথের প্রহরী

বদ্রীনাথ থেকে মানা গ্রাম তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা। প্রথমে ভেবেছিলাম মোটর রাস্তাই যখন আছে, তখন আর মানা অবধি শুধুশুধু হাঁটার পরিশ্রম না করে একটা মোটর ভাড়া করে চলে যাব। কিন্তু মোটরগুলো এমন বেয়াড়া রেট চাইতে লাগল যে শেষ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়ে নিলাম। হাঁটতে শুরু করে দেখলাম রাস্তা বেশ ভালোই, চড়াই উৎরাইও একেবারে নেই বললেই চলে। মানার আগে একটা ইন্ডো টিবেটান বর্ডার পুলিশের স্টেশন পড়ে। এরপরেই একটু উঁচুতে পাহাড়ের গায়ে মানা গ্রাম। মানা গ্রামে ঢুকে ঝরনার ঠান্ডা জল আর স্থানীয় লোকেদের বানানো অদ্ভূত স্বাদের চা খেয়ে আমরা হাঁটা দিলাম গ্রামের শেষ প্রান্তে ভিমপুলের দিকে। ভিমপুল পার হয়েই বসুধারার পথ শুরু। ডানপাশে পাহাড়, বাঁদিকে খাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে অলকানন্দা। দেখলাম পাহাড়ের পাথরের গায়ে খোদাই করে লেখা “বসুধারা – ৬ কিলোমিটার”, নিচে তীরচিহ্ন দিয়ে পথ নির্দেশ করা। ভাঙাচোরা পাথুরে রাস্তা, বেশ ভাল রকম চড়াই। একটু এগিয়ে যেতে বুঝলাম আমার সহযাত্রীরা পিছিয়ে পড়েছে। পরে জেনেছিলাম ওই রাস্তা দেখে ওরা শুরুতেই রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। আমার ততক্ষণে বসুধারায় যাবার জেদ চেপে গেছে। এতক্ষণ পাহাড়ী রাস্তায় চলার সঠিক পদ্ধতির উপর অনেক অযাচিত উপদেশ শুনছিলাম। কেউ কেউ আবার বসুধারায় না যাবার মহামূল্যবান উপদেশও বিতরণ করছিলেন। এবার সেই সব জ্ঞানী হিতৈষীদের ক্রমশই পিছনের ফেলে আসা পথে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে, আমার বসুধারা দেখার উৎসাহ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। হাঁটার পরিশ্রমে এর মধ্যেই ঘামতে শুরু করে দিয়েছি, তাই গায়ের সোয়েটারটা খুলে পিঠে বেঁধে নিয়ে এগিয়ে চললাম বসুধারার পথে।

মানা গ্রামের পারিপার্শ্বিক
মানা গ্রামের পারিপার্শ্বিক

এটাই বসুধারার যাবার পথ
এটাই বসুধারার যাবার পথ

একে যদি রাস্তা বলেন তো রাস্তা, পাহাড় বলেন তো পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলে চলে একটা পথের মত হয়ে গেছে। রাস্তার প্রথম দিকটায় ধ্বসে যাওয়া জায়গাগুলো পাথর ফেলে একটু চলার উপযোগী করে দেওয়া আছে, কোথাও বা পাথর গেঁথে একটু বসার মত একটু জায়গা করা আছে। কিন্তু কিছুটা এগোনোর পর পাহাড়ের গায়ে শুধু একটা পায়ে চলার চিহ্ন মাত্র। উচ্চতা যে খুব দ্রুত বাড়ছে, সেটা দুটো জিনিসেই বুঝতে পারছিলাম। প্রথম দিকে আকাশে কিছু পাখির ওড়াউড়ি ও ডাকাডাকি দৃষ্টি ও কর্ণগোচর হচ্ছিল, কিন্তু এখন নিচে প্রবহমান অলকানন্দার ক্ষীণ কল্লোল ধ্বনি ছাড়া আর একটা শব্দই কানে আসছে; সেটা আমার হাপরের মতো নিশ্বাসের শব্দ। এত কম সময়ের মধ্যে এত প্রবল অক্সিজেন ঘাটতির মধ্যে পড়তে হবে তা কল্পনাও করতে পারিনি আগে। শেষে এমন অবস্থা কয়েক পা করে চলি আর হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ি। মিনিট খানেক বসে, একটু দম নিয়ে ফের পা চালাই। এভাবেই হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে চলতে চলতে পাহাড়ের একটা বাঁক ঘুরেই দেখি সামনে এক মূর্তিমান বিপদ, বিশ ফুটের বেশি চওড়া তুষার প্রপাত। এটা আসলে একটা ঝরনার পথ ধরে নেমে আসা ক্ষুদে হিমবাহ বা পাহাড়ের মাথায় থাকা বড় হিমবাহের লেজ। পুরোটাই এবড়ো খেবড়ো নরম বরফ আর তার ওপর পুরু ধুলোমাটির আস্তরণ। নিচের দিকটা আবার গলে গলে ঝরনা হয়ে ঝরছে। আমার জুতোটা আবার ফ্ল্যাট সোল স্পোর্টস শু, দৌড়ানোর জন্যে খুব ভাল কিন্তু বরফের উপর দিয়ে চলার পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নয়। তাও যা থাকে কপালে ভেবে মিনি গ্লেসিয়ারটার উপর পা রাখলাম। মাঝ বরাবর গিয়ে যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হল। পা হড়কে পড়লাম আর পিচ্ছিল বরফের ঢাল বেয়ে নিচে খাতের দিকে হড়কাতে লাগলাম। কোন উপায় নেই বুঝে, সজোরে গ্লাভস বিহীন হাতের আঙ্গুলগুলো চালালাম নরম বরফের ভিতর। এবার নিচে হড়কানো আটকাতে পারলাম, কিন্তু ততক্ষণে এমন একটা খাঁজের মধ্যে এসে পড়েছি যে ওঠার কোন উপায় দেখছি না। সঙ্গে একটা লাঠিও নিয়ে বেরোইনি যে সেটার সাপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করব। এদিকে হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডায় ক্রমশ অসাড় হয়ে আসছে। এমন সময় এক নেংটি পরা সাধুবাবার আবির্ভাব। সাধুবাবা কৌপীনসার হলে কি হবে, হাতে রয়েছে একটি মোক্ষম লোহার বাঁটওয়ালা দাদুর ছাতা টাইপের ছাতা। এটা বাবাজীর ছাতা কাম ওয়াকিং স্টিক। এটা কাজে লাগিয়ে সাধুবাবা “পকড় কে রহনা, পকড় কে রহনা” করতে করতে এসে আমার দিকে ছাতাটা বাড়িয়ে দিলেন। ছাতাকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে, এবার আমি খাঁজ থেকে বেরিয়ে এলাম। অবশিষ্ট রাস্তা আমরা একসাথে পাড়ি দিলাম।

এবার এই তুষারপ্রপাত পার হও
এবার এই তুষারপ্রপাত পার হও

এখানেই আমি আর একটু হলেই মরতে বসেছিলাম
এখানেই আমি আর একটু হলেই মরতে বসেছিলাম

পথের উচ্চতা বাড়ছে
পথের উচ্চতা বাড়ছে

বাকি পথটুকুতে চড়াইটা আর তত কষ্টকর লাগছিল না। অবশেষে এসে পৌঁছালাম বসুধারা প্রপাতের নিচে। পাহাড়ের গায়ে চারশ ফুট ওপর থেকে অলকাপূরী হিমবাহ গলে আছড়ে পড়ছে দুধ সাদা জলের ধারা। জলের বেশ কিছুটা অংশ অ্যাটমাইজ হয়ে কুয়াশার আকারে ছড়িয়ে পড়ছে তাই জলপ্রপাতের শব্দ কিছুটা কম। নিচে যেখানে জল পড়ছে তার চারপাশেও প্রচুর দানাদার মুচমুচে বরফ জমে আছে। একটু দম নিয়েই, প্রথমে প্রপাতের জলে হাত মুখ ধুয়ে প্রাণ ভরে জল খেয়ে তেষ্টা মেটালাম। ওহ্‌ কি মিষ্টি জল। এত মিষ্টি জল আমি জীবনে আর কখনো খাইনি। এবার কিছু ফটো তোলার পালা, এই সময়েই সাধুবাবা বরফের উপর বসে তার সুপারম্যান মার্কা পোজটা দিলেন আর আমিও তা ক্যামেরা বন্দি করে ফেললাম। এরপর আমার সুপারম্যান সাজার পালা, ক্যামেরা সাধুবাবার হাতে। বসুধারার পাশে এক গুহাতে একজন মৌনি সাধুবাবা বাস করেন। তিনি মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না। তবে তাঁর একটি চ্যালা আছে, সে কথাবার্তায় বেশ টগবগে। তার দৌলতে ফুটন্ত গরম এলাচ চা খেলাম বসুধারা পাশে পাথরের উপর বসে। এবার ফেরার পালা। ফেরার রাস্তায় নামল পিটপিট করে বৃষ্টি। এদিকে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, অন্ধকার নামার আগে যেভাবেই হোক মানা গ্রামে পৌঁছতেই হবে। অতএব সাধুবাবার আইডিয়া নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে নামা শুরু করলাম। দৌড়ানোয় আমার জুতোটাও যারপরনাই সাহায্য করতে লাগল। শুধু কেন যে পড়ে হাত পা ভাঙল না, সেটাই আমার কাছে আজ অবধি বোধগম্য হল না। মানায় এসে দেখি আমার বাকি সঙ্গীরা, আমি মানাতেই আছি ধরে নিয়ে এদিক ওদিক খোঁজা খুঁজি করছে। বসুধারা ঘুরে এলাম শুনে তাদের চক্ষু চড়কগাছ। বলে “ওই রাস্তা দিয়ে গেলে কি করে? বসুধারায় পোঁছাতে পেরেছ তো আদৌ?” পরে ছবির প্রিন্ট দেখিয়ে ওদের বিশ্বাস করাতে পেরেছিলাম, যে আমি সত্যিই বসুধারায় গেছি।

অবশেষে বসুধারায়
অবশেষে বসুধারায়

স্বর্গারোহনীর পথ, বসুধারা থেকে দেখা
স্বর্গারোহনীর পথ, বসুধারা থেকে দেখা

সুপারম্যানের ভূমিকায় সাধুবাবা
সুপারম্যানের ভূমিকায় সাধুবাবা

এবার আমার রাজা সাজার পালা
এবার আমার রাজা সাজার পালা

কাছ থেকে বসুধারার নয়নমনোহর রূপ
কাছ থেকে বসুধারার নয়নমনোহর রূপ

কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়ছে জলকণা
কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়ছে জলকণা

আমাদের পথ চলার নীরব সাক্ষী
আমাদের পথ চলার নীরব সাক্ষী

গুগল আর্থ ভিউ-তে বসুধারা
View Larger Map

শুক্রবার, ২৬ মার্চ, ২০১০

হাঁটাপথে লাভা থেকে রিশপ

সবার সাবধানবাণী ও উপদেশ উপেক্ষা করেই ২০০৮ সালের পুজোটা কাটালাম দার্জিলিং-এ। প্রথম দিন থেকেই আমাদের সঙ্গী হয়েছিল কুয়াশা আর মেঘ। দ্বিতীয় দিনে সাথি হল বৃষ্টি। তাই তৃতীয় দিনে দার্জিলিং থেকে কালিম্পং হয়ে চলে এলাম লাভায়। লাভায় এসে মনে হল আমাদের উপর প্রকৃতি দেবীর ক্রোধ বোধহয় কিঞ্চিত প্রশমিত হয়েছে। তাই পরের দিন রিশপ পর্যন্ত পাহাড়ী পথ পায়ে হেঁটে অর্থাৎ ট্রেক করে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। লাভা থেকে ঋষভ ট্রেকিং করে চলার পথে যা দুচোখে পড়ল, চেষ্টা করলাম যতটুকু পারি ক্যামেরায় বন্দি করে রাখতে।

লাভার সকাল

রোদে ঝলমল করছে বৌদ্ধমঠ

এই রে কুয়াশা আসছে!

রিশপের রাস্তা থেকে। কুয়াশারা ওখানেই পড়ে থাক!

লাভার নৈসর্গিক ল্যান্ডস্কেপ। এখানেও সঙ্গীন উঁচিয়ে মোবাইল টাওয়ারের দাপট...

পার্বত্য নিসর্গের মাঝে...

একটু 'জুম' করে...

চলো, হারিয়ে যাই...

কুয়াশাটা দেখছি পিছু ছাড়বে না...

আমি এখানে---

রিশপে কুয়াশা জব্দ...



রিশপে পাহাড়ী ফুলের ডালি...

ক্লান্ত পায়ে লাভায় ফিরে...

রিশপ লাভা থেকে অনতিদূরে অবস্থিত একটি পাহাড়ী গ্রাম, যা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নানা পাহাড়ী ফুলের প্রাচুর্যের কারণে, একটি নেচার রিসর্টের মর্যাদা পেয়েছে। লাভা থেকে ঋষভ যাবার পথ, পাহাড়ী কাঁচা রাস্তা, যা দিয়ে শুকনো মরসুমে, জিপ জাতীয় গাড়ী চলতে পারে। কিন্তু রাস্তার দুধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হেঁটে যাওয়া, জিপের প্রানান্তকর ঝাঁকুনির থেকে অনেক বেশী উপভোগ্য। লাভা সম্পর্কে জানতে নিচের ওয়েব সাইটটা দেখুন:
http://bengali.webdunia.com/entertainment/tourism/bangladarshan/0704/22/1070422015_1.htm

সোমবার, ২২ মার্চ, ২০১০

কিছু এলোমেলো ছবি

গত দশবছরে নানা হুজুগে অনেক ছবি তুলেছি। বেশির ভাগ ছবিই দলবদ্ধতার জোরে ঠাঁই করে নিয়েছে কোন না কোন ফটো অ্যালবামে। কিন্তু কিছু মুখচোরা ছবি থেকে গেছে যাদের স্বজাতির লোকবলের অভাবে, ঠাঁই পায়নি কোন অ্যালবামের পাতায়; একা একা ব্রাউনপেপারের খামের মধ্যে দিন কাটানোই যেন তাদের ভবিতব্য হয়ে গিয়েছিল। কাল ঝোঁকের মাথায় ধুলো ঝেড়ে এদের জড়ো করে নিয়ে বসলাম স্ক্যানে চাপাতে; উদ্দেশ্য এইসব ঘরছাড়াদের একটা স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া। সেই সব ছবিগুলোই শেয়ার করলাম এখানে। কিছু ছবি প্রায় দশ বছরেরও বেশি পুরনো, কমদামের কালার ফিল্মে তোলা, সস্তা ম্যানুয়াল যন্ত্রে প্রিন্ট করা। তাই গ্রেন ও রঙের তারতম্য এই ছবিগুলোর পাকাপোক্ত বৈশিষ্ট। দেখুন কেমন লাগে।

দুর্গাপুরে দামোদরের তীরে

দুর্গাপুর ব্যারেজ

দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গায় সূর্যাস্ত

গঙ্গাবক্ষ থেকে হাওড়া স্টেশন

কলকাতায় দুর্গাপূজার মণ্ডপ

অযত্নে ফুটে থাকা ফুলেরা

ঝরে পড়া কাগজফুল (বোগেনভিলিয়া)

মান্না দে-এর কণ্ঠে হরিবংশ রাই বচ্চনের ‘মধুশালা’

যাঁরা হিন্দি সাহিত্য নিয়ে কিছু খোঁজখবর রাখেন, হরিবংশ রাই বচ্চনের নাম তাঁরা প্রায় সবাই জানেন বলে মনে হয়। হয়তো এটাও জানেন যে হরিবংশ রাই বচ্চনই হলেন বিখ্যাত বলিউড স্টার অমিতাভ বচ্চনের বাবা। তবে ছেলে যতই বিখ্যাত হোক না কেন, হরিবংশ রাই-এর প্রধান পরিচয় কিন্তু তাঁরই লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ, যার নাম ‘মধুশালা’। এই সেই বিখ্যাত রচনা যা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হওয়ার সাথেসাথেই হরিবংশ রাইকে এনে দিয়েছিল খ্যাতির পাদপ্রদীপের আলোয়। এই কাব্যগ্রন্থটি আজও হিন্দি সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলির মধ্যে অন্যতম হিসাবে পরিগণিত হয়।

এবার আসি ‘মধুশালা’র ব্যাখ্যায়। মধুশালা (Hindi: मधुशाला) শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে, পানশালা অর্থে। এই বইটিতে রয়েছে হরিবংশ রাই বচ্চনের রচিত মোট ১৩৫টি চার লাইনের কবিতা, যাকে আরবীতে রুবাই (رباعی) বা বহুবচনে রুবাইয়াত (رباعیا) বলা হয়ে থাকে। কবিতাগুলির আলাদা করে কোন নাম দেওয়া হয়না, শুধু সংখ্যা দিয়ে এগুলিকে চিহ্নিত করা হয় শ্লোক বা আয়াতের মতো। এই ১৩৫টি রুবাই-এর প্রত্যেকটিই সমাপ্ত করা হয়েছে ‘মধুশালা’ শব্দটি দিয়ে। এই সুফী ভাবনা ও গভীর দার্শনিক বোধের দ্বারা প্রভাবিত এই কবিতাগুলিতে, কবি হরিবংশ রাই বচ্চন জীবনের জটিল ঘাতপ্রতিঘাতকে মোট চারটি প্রতীকী উপাদান – মধু, মদিরা, সাকি ও পেয়ালা এবং অবশ্যই মধুশালা, যা কিনা প্রতিটি রুবাইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার সাহায্যেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এই metaphor গুলি মধুশালার প্রায় সবকটি রুবাইতেই ঘুরে ফিরে আসতে দেখি আমরা। মধুশালার সাহিত্য প্রকাশভঙ্গি হিন্দি সাহিত্যের ছায়াবাদী ধারার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মধুশালা প্রকাশিত হওয়ার পর এতে মদ্যপানের প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ঊঠেছিল। হরিবংশ রাই তাঁর নিজের জীবনীতে লিখেছেন, মহাত্মা গান্ধী মধুশালার কবিতাগুলি শোনার পরে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে মন্তব্য করেন।

ওমর খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ অনুবাদ করতে গিয়ে, গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন হরিবংশ রাই বচ্চন। তারই পরিণতিতে তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে আসে রুবাইয়াতের ট্রিলজি (Trilogy), যার প্রথমটিই হল মধুশালা। পরের দুটির নাম যথাক্রমে মধুবালা (১৯৩৬) ও মধুকলস (১৯৩৭)। মধুশালা প্রকাশিত হওয়ার পরে বিভিন্ন কবিসম্মেলনে কবির স্বকণ্ঠে কবিতাটির সঙ্গীতময় আবৃত্তি শোনার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকত। মধুশালা আজও সর্বাধিক বিক্রিত হিন্দি কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম। এখনও প্রতি বছর এর দুই থেকে তিনটে করে সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মধুশালার রুবাইগুলি আবৃত্তি, গান ও কোরিওগ্রাফির মধ্যে দিয়ে বহুবার উপস্থাপনা করা হয়েছে। প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী মান্না দের কণ্ঠে মধুশালার নির্বাচিত কুড়িটি স্তবকের রেকর্ডিং প্রকাশ করেছিল HMV। এই রেকর্ডে মধুশালার প্রথম স্তবকটি শোনা যায় কবি হরিবংশ রাই বচ্চন-এর স্বকণ্ঠে। পরেরগুলি গেয়েছেন মান্না দে, তাঁর স্বকীয় শৈলীতে।

মান্না দের কণ্ঠে শুনুন মধুশালা:

অথবা ডাউনলোড করে নিন এখান থেকে:  http://soundcloud.com/jaybrata/madhushala/download

মধুশালার সিডি কভার

মধুশালা সম্পর্কে আরও জানুন: http://en.wikipedia.org/wiki/Madhushala

মধুশালা পড়ুন: http://www.manaskriti.com/kaavyaalaya/mdhshla.stm

মান্না দের গাওয়া মধুশালার কুড়িটি স্তবকের অনুবাদ: http://reocities.com/Paris/2583/madhushaalaa.html

শনিবার, ২০ মার্চ, ২০১০

পল রোবসনের কণ্ঠে “Old Man River” : সংগীতের ক্রমবিবর্তন

পল রোবসন 
জগদ্বিখ্যাত মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিবাদী কণ্ঠশিল্পী পল রোবসনের নাম, প্রতিটি সংগ্রামী মানুষেরই জানা। তাঁর গাওয়া একটি বিখ্যাত গান “Old Man River” গোটা পৃথিবীর গণসঙ্গীতের ধারাকে প্রভাবিত করেছে। বাংলা ভাষায় ভূপেন হাজারিকা সহ একাধিক শিল্পীর কন্ঠে এই গানটির অনুপ্রেরণায় রচিত “বিস্তীর্ণ দুপারে” হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন। আমি এখানে মূল “Old Man River” গানটি পল রোবসনের নিজের কণ্ঠে কিভাবে পরিবেশন করতেন তা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। এই গানটি রোবসন প্রায় সমস্ত সঙ্গীতজীবন জুড়ে একাধিক বার গেয়েছেন। এখানে আমি প্রথম যে ট্র্যাকটি দিয়েছি সেটি ১৯২৮ সালে গাওয়া। এর পরেরটি ১৯৩৬ সালে গাওয়া। তৃতীয়টির রেকর্ডিং-এর সময় সঠিক ভাবে জানা না থাকলেও, যে এটি ১৯৩৬ ও ১৯৫৮ সালের মাঝেই করা, এবিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। কারণ সর্বশেষ ট্র্যাক যেটি ১৯৫৮ সালে লাইভ রেকর্ডেড, তাতে কন্ঠে বয়সের ছাপ এর থেকে অনেক বেশী, আবার ১৯৩৬ সালের রেকর্ডিং-এ কণ্ঠ এর থেকে অপেক্ষাকৃত নবীন। যাই হোক, গানগুলি শোনার সময় যে দিকটায় খেয়াল রাখবেন তাহলো, সময়ের সাথে সাথে নিগ্রো স্পিরিচুয়ালের আবরন ভেঙে গানের উপস্থাপনায় প্রতিবাদের সুর কিভাবে সোচ্চার হচ্ছে রোবসনের কণ্ঠে। এবার শুনতে থাকুন।

Paul Robeson – Old Man River (1928)

Paul Robeson – Old Man River (1936)

Paul Robeson – Old Man River (undated)

Paul Robeson – Old Man River (Carnegie Hall 1958)

পাদটীকাঃ পল রোবসন তাঁর সঙ্গীতজীবন শুরু করেন, নিগ্রো স্পিরিচুয়াল গান দিয়ে। তখন মার্কিন যুক্তরাজ্যে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করতে কৃষ্ণাঙ্গরা বড় একটা সাহস পেতেন না। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, পল রোবসন কলেজ দলে খেলতে গিয়ে, নিজের দলেরই শ্বেতাঙ্গ সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। তারা মেরে তাঁর নাক ভেঙে দেয় ও কাঁধের হাড় ডিসলোকেট করে দেয়। এরকম অবস্থায় পল তাঁর নিগ্রো স্পিরিচুয়াল গানের মধ্যে দিয়েই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা তুলে ধরতে থাকেন। ক্রমে এর মধ্যে সূক্ষ্মভাবে প্রতিবাদের সুর ফুটিয়ে তুলতে থাকেন। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম ক্রমশ দানা বাধতে থাকলে পলের কণ্ঠে প্রতিবাদের সুরও ক্রমশ সোচ্চার হতে থাকে। এখানে তৃতীয় গানটি সম্ভবত নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সর্বোচ্চ সময়ে গাওয়া। লক্ষ করুন এর স্বরক্ষেপণ। লক্ষ করুন ক্রোধে ও যন্ত্রণার প্রকাশ।

আউলি স্কি ভিলেজে একদিন

এই প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে, চলুন একটু ছবির সফরে, বরফের সাম্রাজ্য, স্কি ভিলেজ আউলিতে। ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের একদম উত্তরপ্রান্তে, অসংখ্য তুষারমন্ডিত শৃঙ্গে ঘেরা গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই থেকে তিন হাজার মিটার উচ্চতায়, ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম আউলিকে ঘিরে তৈরী হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্কি ভিলেজ। প্রতি বছর শীতকালে আউলির পাহাড়ি ঢালগুলো যখন সাদা বরফের পুরু আস্তরণে ঢেকে যায়, তখন আউলির স্কি রিসর্টে জমে ওঠে স্কি শেখার আসর আর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের স্কি প্রতিযোগিতা। বছরদুয়েক আগে গিয়েছিলাম আউলিতে, ভেবেছিলাম স্কিতে একটু হাত মক্স করবো। কিন্তু স্কি তো শেখা হলো ছাই, শুধু সারাদিন ধরে ক্যামেরার সাটারটা ব্যস্ত রেখে গেলাম। সেই সব ছবিরই কিছু টুকরো টাকরা এখানে দিলাম, এই গরমে চোখের শান্তি তো হবে। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, আউলির ১৮০° খোলা দিগন্ত থেকে হিমালয়ের যে তুষার শৃঙ্গগুলি দেখা যায়, সেগুলি হল - নন্দাদেবী, মানা পর্বত, কামেট, দ্রোণাগিরি, ত্রিশুল (কিছুটা) ইত্যাদি। আউলি যাওয়ার সহজ পথ - কলকাতা থেকে হরিদ্বার ট্রেনে (দুন ও ঊপাসনা এক্সপ্রেস) - হরিদ্বার থেকে যোশীমঠ বাস বা রিজার্ভ কারে (সারাদিন লেগে যাবে) - যোশীমঠ থেকে পৃথিবীর উচ্চতম রোপওয়েতে চেপে আউলি (স্কি সিজনে গেলে ভুলেও গাড়িতে যাবার চেষ্টা করবেন না। শেষের দিকে অনেকটা চড়াই পথ বরফের উপর পায়ে হেঁটে যেতে বাধ্য হবেন, ঠিকঠাক স্নোবুট না থাকলে ভোগান্তির শেষ থাকবে না। তাছাড়া রোপওয়ে থেকে বরফ ঢাকা হিমালয়ের যে সৌন্দর্য চোখে পড়বে, তার তুলনা হয় না।)। আউলিতে একটাই থাকার ঠিকানা, তা হলো জিএমভিএন-এর স্কি রিসর্ট। তাই আগে থাকতে ঘর বুক করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। যোশিমঠেও জিএমভিএন-এর হোটেলে থাকাই সুবিধাজনক। হরিদ্বারে অগুনতি হোটেল, শুধু একটু দেখে শুনে নিলেই হলো। জিএমভিএন-এর আন্তর্জাল ঠিকানা http://www.gmvnl.com/। ওখানে অনলাইন হোটেল বুকিং ও স্কি প্রশিক্ষনে যোগ দেবার ব্যবস্থা আছে। GMVN-এর কলকাতা অফিসের ঠিকানা:

Garhwal Mandal Vikas Nigam Ltd.
Room no. 224, Marshall House 33/1
2nd floor Netaji Subash Road
Kolkatta - 700001
Tel / Fax : 033-22315554
Email: prokolkatta@vsnl.net

আর একটা কথা, স্কি-এর মরশুমে আউলিতে গেলে বরফে পরার ঘন কালো রোদচশমা আর ভাল শীতের পোষাক নিতে কোনভাবেই ভুলবেন না যেন। বরফে হাঁটার জুতো, ওখানেই ভাড়া পেয়ে যাবেন।

যাবার পথে
যাবার পথে

পাহাড়ে ঘেরা দিগন্ত
পাহাড়ে ঘেরা দিগন্ত

বরফের সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবে রোপওয়ে
বরফের সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাবে রোপওয়ে

পরিবেশবন্ধু বিকল্প বিদ্যুতের খোঁজে
পরিবেশবন্ধু বিকল্প বিদ্যুতের খোঁজে

বরফে মোড়া পাহাড়ি প্রান্তর
বরফে মোড়া পাহাড়ি প্রান্তর

এটা স্কি খেলার মাঠ
এটা স্কি খেলার মাঠ ;)

রোপওয়ে লান্ডিং স্টেশান
রোপওয়ে লান্ডিং স্টেশান

আউলির দিগন্ত এরকমই
আউলির দিগন্ত এরকমই

সাদা রঙ সবুজকে হারিয়ে দিতে পারেনি
সাদা রঙ সবুজকে হারিয়ে দিতে পারেনি

পাহাড়ের ঢাল
পাহাড়ের ঢাল

আমি আছি
আমি আছি!

ঘরের জানলা থেকে
ঘরের জানলা থেকে

নিচে পাহাড়ি গ্রাম
নিচে পাহাড়ি গ্রাম

আর একটু জুম করে
আর একটু জুম করে

ভাষা খুজে পাইনা
ভাষা খুঁজে পাইনা

শিক্ষক ও ছাত্র
শিক্ষক ও ছাত্র

ওই যে ওরা মাঠে নেমে পড়েছে
ওই যে ওরা মাঠে নেমে পড়েছে

এরা আমায় নিরন্তর হাতছানি দেয়
এরা আমায় নিরন্তর হাতছানি দেয়। আবার কবে আসবে, আমাদের কোলে?